চাপের মধ্যে তালাক দেওয়া হয়েছে – করণীয় কী? ফতোয়া চাই
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি।
আমার একটি অত্যন্ত জরুরি ও গুরুতর মাসআলা আছে। দয়া করে কুরআন-হাদিসের আলোকে ফতোয়া দান করবেন।
আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু ভুল বোঝাবুঝির কারণে ঝগড়া হয়। এরপর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমার বাড়িতে এসে আমার স্ত্রীকে “বেড়াতে নিয়ে যাব” বলে নিয়ে যায়।
পরে আমি স্ত্রীকে আনতে শ্বশুরবাড়িতে গেলে আমাকে আটকে রাখা হয়। আমার বাবা-মাকে খবর দেওয়া হয় এবং কাজী ডেকে আনা হয়।
তারপর আমাকে জোর করে, চাপ দিয়ে এবং কাজী যা যা বলতে বলেছেন ঠিক তাই মুখে উচ্চারণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমি না বুঝে/ভয়ে/চাপে তালাকের কথা বলে দিয়েছি।
বর্তমান অবস্থা:
এখন আমরা দুজনেই (স্বামী ও স্ত্রী) ভুল বুঝতে পেরেছি এবং সংসার চালিয়ে যেতে চাই। আমরা একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারছি না।
প্রশ্ন:
১. ইসলামে এমন জোরপূর্বক/চাপের মধ্যে (আটকে রেখে, কাজী ডেকে বাধ্য করে) দেওয়া তালাক কি বৈধ হয়?
২. যদি বৈধ না হয়, তাহলে আমরা কি এখনো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে পারি?
৩. যদি তালাক হয়ে থাকে, তাহলে করণীয় কী? (রুজু করা যাবে কি? নাকি নতুন নিকাহ করতে হবে?)
দয়া করে বিস্তারিতভাবে কুরআন-হাদিস ও ফিকহের আলোকে উত্তর দান করবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের খেদমতে আরও বেশি তৌফিক দান করুন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান কাসীরান।
[সবুজ]
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। জোরপূর্বকা বা চাপ দেয়া দুই প্রকার। ১। সাধারণ চাপ দেয়া। যেমন, বকাবকি করা, গালিগালাজ করা, হালকা আর্থিক ক্ষতি করা। এমন অবস্থায় মুখে উচ্চারণ করে তালাক দিলে সকল ফকিহের মতে তালাক কার্যকর হবে।
২। প্রচন্ড চাপ দেয়া। যেমন, তালাক না দিলে হত্যা করবে, অঙ্গহানী করবে, প্রচন্ড মারধর করবে, বিশাল আর্থিক ক্ষতির করবে। এমন হলে অধিকাংশ আলেম ও ফকীহর মতে তালাক কার্যকর হবে না। হানাফী মাজহাবের ফকীহদের মতে এই অবস্থাও তালাক কার্যকর হবে।
বিখ্যাত ফিকহী বিশ্বকোষ “আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাতিল কুয়েতিয়্যাহ” এর ভাষ্য হলো
وقد ذَهَبَ جُمْهُورُ الْفُقَهَاءِ إِلَى عَدَمِ وُقُوعِ طَلاَقِ الْمُكْرَهِ إِذَا كَانَ الإْكْرَاهُ شَدِيدًا، كَالْقَتْل، وَالْقَطْعِ، وَالضَّرْبِ الْمُبَرِّحِ، وَمَا إِلَى ذَلِكَ، وَذَلِكَ لِحَدِيثِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: (لاَ طَلاَقَ وَلاَ عَتَاقَ فِي إِغْلاَقٍ) وَلِلْحَدِيثِ الْمُتَقَدِّمِ: (إِنَّ اللَّهَ وَضَعَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ) وَلأِنَّهُ مُنْعَدِمُ الإْرَادَةِ وَالْقَصْدِ، فَكَانَ كَالْمَجْنُونِ وَالنَّائِمِ، فَإِذَا كَانَ الإْكْرَاهُ ضَعِيفًا، أَوْ ثَبَتَ عَدَمُ تَأَثُّرِ الْمُكْرَهِ بِهِ، وَقَعَ طَلاَقُهُ لِوُجُودِ الاِخْتِيَارِ" وَذَهَبَ الْحَنَفِيَّةُ إِلَى وُقُوعِ طَلاَقِ الْمُكْرَهِ مُطْلَقًا
চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে তালাক দিলে অধিকাংশ ফকিহের মতে তালাক কার্যকর হবে না, যদি চাপটা তীব্র হয়। যেমন, হত্যা, অঙ্গহানী, প্রচন্ড মারধর ইত্যাদি। এই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জোর-জবরদস্তিমূলক তালাক ও (ক্রীতদাস বা দাসী) মুক্তি হয় না। (সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ২০৪৬, হাদীসটি হাসান।)। আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের ভুল ক্রমে করে ফেলা এবং আবশ্যিক বিষয় করতে ভুলে যাওয়া ও বাধ্য অবস্থায় করে ফেলা পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (সুনানু ইবনু মাজাহ, হাদীস নং ২০৪৫, শায়খ আলবানী রহি, বলেছেন, হাদীসটি সহীহ।)। তালাক কার্যকর না হওয়ার কারণ হলো বাধ্য হয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক দেয়া ব্যক্তি পাগল বা ঘুমন্ত ব্যক্তির হুকুমে। তবে যখন চাপটা দূর্বল হবে অথবা চাপের কারণে তার কোন সমস্যা হবে না তখন তালাক পতিত হবে। হানাফী আলেমগণ বলেছেন, বিনা শর্তে তালাক কার্যকর হবে। ২৯/১৭পৃষ্ঠা।
এখন আপনি চিন্তা করুন আপনার চাপ কোন পর্যায়ের ছিল।
যদি তিন তালাক দেন আর সেটা কার্যকর হয় তাহলে নতুন সংসারে কোন সুযোগ নেই। নতুন করে বিবাহ করারও কোন সুযোগ নেই। তিন তালাকের পর আর সংসার করার কোন উপায় থাকে না। তবে যদি স্বাভাবিকভাবে ঐ নারীর অন্য কোথাও বিবাহ হয় এবং সেই সংসার থেকে তালাক হয় বা স্বামী মারা যায় তাহলেই কেবল এই নারী আগের স্বামীর সাথে বিবাহ করতে পারবে।